ইরানের ভেতরের খবর দেখে আমি গভীর শোকে ভেঙে পড়ছি। একজন ইরানি হিসেবে আমি এই শাসনের হাতে কারাবন্দি ও নির্যাতিত হয়েছি। বহুদিন ধরে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমের কাছে অনুরোধ করে আসছি যেন তারা ইরানের মানুষের দুর্দশার দিকে নজর রাখে। কিন্তু এখন আমি দেখছি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা ইরানের ওপর পড়ছে, এতে নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে আর কিছু ইরানি সেই যুদ্ধকে স্বাগত জানাচ্ছে। আমার দেশের জন্য আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে।
একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন এই যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা করেন, তখন তা ইরানের মানুষকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার ইচ্ছা থেকে হয়নি। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘এই জোট আমাকে সেই কাজটি করার সুযোগ দিয়েছে, যা আমি ৪০ বছর ধরে করতে চেয়েছি।’ তিনি এ অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘লায়নের রোর’। এদিকে ইরান রাজতন্ত্রপন্থিরা এ হত্যাযজ্ঞ উদযাপন করছে। তারা শাহর আমলের মুকুটখচিত সিংহ ও সূর্যের পতাকা উড়িয়ে আনন্দ করছে।
শাসকগোষ্ঠী যখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে বেছে নিয়েছে, তখন নির্বাসনে থাকা আরেক ব্যক্তি রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি হলেন রেজা পাহলভি, সাবেক শাহর ছেলে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে যাকে সরাতে ইরানিরা এত সংগ্রাম করেছিল, সেই পরিবারের উত্তরসূরি এখন মনে করছেন, দেশ পরিচালনার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত। ১ মার্চ তিনি এক বার্তায় লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধে নিহত তিনজন মার্কিন বীর এবং আহত পাঁচজনের জন্য আমার হৃদয় ব্যথিত। ইরানের মানুষ তাদের কাছে চিরঋণী। তাদের শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের অপরিসীম ভালোবাসা, গভীর সমবেদনা এবং চিরন্তন কৃতজ্ঞতা রইল।’ তিনি ইরানির চেয়ে বেশি আমেরিকান বলেই মনে হয়। তিনি যদি সত্যিই ইরানি হতেন, তাহলে এ হামলায় নিহত হাজারো ইরানি সাধারণ মানুষের জন্যও শোক প্রকাশ করতেন। নিহতদের মধ্যে ১৫০ জনের বেশি স্কুলছাত্রীও আছে বলে এখন ধারণা করা হচ্ছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এক হামলায় মারা গেছে।
ইরানের ভেতরে যারা রাজতন্ত্রপন্থি পতাকা তুলছে, তাদের আর দেশের বাইরে একই কাজ করা মানুষদের একভাবে বিচার করা ঠিক হবে না। প্রবাসী কিছু রাজতন্ত্রপন্থি একসময় ইসলামী শাসনেরই অংশ ছিল আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যুদ্ধ তাদের আবার ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ইরানের ভেতরের মানুষ ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ দেখেছে। তারা খুব ভালো করেই জানে, যুদ্ধ মানে ভয়াবহতা আর মৃত্যু। তারা বহুবার শাসনের হাতে মরেছে। একজন ডুবন্ত মানুষ যেমন বাঁচার জন্য যে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে, যদিও সেটাই তাকে আরও নিচে টেনে নিতে পারে, তেমনি কিছু মানুষ পাহলভিকে মেনে নিতে চাইছে। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তার বাবা মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। এখন আমরা যেন সেই রকম আরেকটি প্রচেষ্টাই দেখতে পাচ্ছি।
ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং পাহলভি আবারও ইরানের মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু আমি মনে করি না, মানুষ আগের আহ্বানের ফল এত দ্রুত ভুলে গেছে। ১৩ জানুয়ারি ট্রাম্প ইরানিদের বলেছিলেন, ‘প্রতিবাদ চালিয়ে যান, সাহায্য আসছে।’ কিন্তু কোনো সাহায্য আসেনি। বরং ধারণা করা হয়, হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। এখন আবার ট্রাম্প মানুষকে বলছেন, রাস্তায় নামতে এবং ‘নিজেদের সরকার দখল করে নিতে’। কিন্তু এবারও কোনো সাহায্য আসছে না, আসছে শুধু বোমা।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য, পাহলভির একই ধরনের আহ্বান এবং ট্রাম্পের মানুষকে আবার বিক্ষোভে নামার অনুরোধ, বাস্তবে নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ, এতে শাসকগোষ্ঠী খুব সহজে বলতে পারে, যারা রুটি আর স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নামছে, তারা বিদেশি শক্তির দালাল। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ শাসন বারবার কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের এজেন্ট বলে অভিযুক্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে যারা নিহত হয়েছে, তাদের পাশাপাশি ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে শত শত শিশু রয়েছে।
একটি দেশে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন অভিযোগেই মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, সেখানে সাধারণ মানুষকে এমন আহ্বান জানানো অত্যন্ত বেপরোয়া এবং প্রাণঘাতী। আমার মনে হয়, অনেক শক্তিই মানুষের সত্যিকারের গণঅভ্যুত্থানকে ভয় পেয়েছে। শুধু শাসকগোষ্ঠী নয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও যেন ভয় পেয়েছে যে, ইরানের মানুষ নিজেরাই হয়তো ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করে ফেলবে। সাধারণ মানুষের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এ কারণে এই তথাকথিত শাসন পরিবর্তনকে খুব হিসাব করে পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে তা নিচ থেকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠতে না পারে। যারা বলেন, এ যুদ্ধের লক্ষ্য ইরানকে মুক্ত করা নয়, কিংবা গুলি কখনো রুটি ও স্বাধীনতা এনে দেয় না, তাদের ওপর রাজতন্ত্রপন্থিরা চড়াও হয়। তারা বলে, ‘তুমি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো শাসকশ্রেণির সঙ্গে।’ এটাই তাদের রাজনীতির ধারণা। কারণ, তারা কখনো প্রকৃত রাজনৈতিক সংগ্রামে সক্রিয় ছিল না, কারাগার বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই।
বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর আমার প্রজন্ম তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমাদের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে আর সে সময় বহু রাজতন্ত্রপন্থি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এখন সেই রাজতন্ত্রপন্থিরাই বিদেশি আগ্রাসন ও সাধারণ মানুষের হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ইরানিদের নিন্দা করছে। আমি শুনেছি, তাদের একটি স্লোগান হলো, ‘মোল্লা, বামপন্থি ও মুজাহিদিনদের মৃত্যু হোক’। ভাবুন একবার, এত দশক ধরে শাসনের ফাঁসিতে মানুষ মরার পর এখন রাজতন্ত্রপন্থিরাও একইভাবে একই মানুষদের চুপ করিয়ে দিতে চাইছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যখন এসব শক্তি ইরানের মানুষের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে, তখন বিশ্বের অন্য সবার উচিত এ আকাশ থেকে চালানো গণহত্যার বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ানো। আমি আশা করি, পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে এবং এর অবসান দাবি করবে।
লেখক: ইরানের একজন নারী অধিকারকর্মী এবং নির্যাতনের শিকার এক সংগ্রামী নারী। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি