কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী এখন আক্ষরিক অর্থেই এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। একদিকে অজ্ঞাত রকেটের আঘাতে পণ্যবাহী জাহাজে আগুন ধরে গেছে, অন্যদিকে ১৬টি ইরানি মাইনবাহী জাহাজ গুঁড়িয়ে দেয়ার মার্কিন দাবি, সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরে এখন পূর্ণাঙ্গ নৌযুদ্ধের দামামা বাজছে।
মঙ্গলবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীর কাছে ১৬টি ইরানি মাইন-স্থাপনকারী জাহাজ ‘নির্মূল’ করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে কোনো মাইন পেতে থাকে, যদিও আমাদের কাছে তেমন কোনো রিপোর্ট নেই, তবে আমরা চাই সেগুলো অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়া হোক! এখনই!
ট্রাম্প আরও জানান, মাদক চোরাচালান দমনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এখন ইরানি নৌযান ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, যারা এই জলপথে মাইন বসানোর চেষ্টা করবে, তাদের চিরতরে মিটিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে বুধবার সকালে ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজে আগুন ধরে যাওয়ায় ক্রুরা সাহায্যের আবেদন জানিয়ে জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বর্তমানে এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এক্সে প্রথমে দাবি করেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী সফলভাবে একটি তেলের ট্যাঙ্কারকে প্রহরার মাধ্যমে পার করে দিয়েছে। কিন্তু নাটকীয়ভাবে কিছুক্ষণ পরই তিনি সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন।
প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট পরে স্পষ্ট করেন, এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন বা মিত্র জাহাজকে এসকর্ট করা হয়নি। জ্বালানি দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভিডিওটির ক্যাপশন ভুল থাকায় সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডসের মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি মার্কিন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমেরিকা বা তাদের মিত্রদের যে কোনো নড়াচড়া আমাদের মিসাইল ও ড্রোনের মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া হবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। চলমান যুদ্ধের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে আগুন লেগেছে।
জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, তারা জাহাজগুলোকে এসকর্ট করার বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখছেন, যদিও নৌবাহিনী এখনো শিপিং ইন্ডাস্ট্রিগুলোর অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ট্রাম্পের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’র জবাবে ইরানের ড্রোন আর মিসাইল, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকীর্ণ জলপথটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ফাটল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাইন আর মিসাইলের এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।